রিসেন্টলি আগারগাঁওয়ের কেক খুব ভাইরাল হলো। লোকজন এর তুমুল ভিড়, ছবি আর রিলস দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ভরপুর। যাবার ইচ্ছা হলো।
আমার এক ফ্রেন্ড দেখা করতে আসবে মেট্রোতে, তাঁকে বললাম আগারগাঁও নামেন, আমিও আসছি। দুজনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মানুষের উন্মাদনা দেখছিলাম সেইদিন।
এরপর পুলিশ একদিন সবাইকে সরিয়ে দেয়, সেটা ঠিক না বেঠিক সেগুলো আলাদা গল্প। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমার আগ্রহ অন্য জায়গায় – মানুষ কেন হুড়মুড় করে চলে যায় আর ভাইরাল বানায় কোন কিছু।
যেমন গত ঈদে তাণ্ডব বা উৎসব সিনেমা দেখে লোকজন দলে দলে হল ভরল, কাট আউটের সামনে ছবি তুলল, পোস্ট দিল। অনেক ক্ষেত্রেই মুভি দেখার থেকে, মুভি দেখতে যাওয়া হয়েছে, এটা দেখানোই যেন প্রধান কারণ। আগারগাঁওয়ের কেকের ক্ষেত্রেও তো একই দৃশ্য – খাওয়া কম, ছবি তোলা বেশি।
এই প্রবণতা নতুন কিছু না। কয়েক বছর আগের কথা মনে আছে? মাওয়ায় ইলিশ রেস্তোরা চালু হতেই যেমন ঢাকায় প্রতিযোগিতা শুরু হলো – কে আগে যাবে, কে কত রাতে যাবে। আমিও গিয়েছিলাম। দাম দেখে আস্তে করে পাশের ছোট একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়েছিলাম।কিন্তু ছবি তুলে শেয়ার দিয়েছিলাম ইলিশ রেস্টুরেন্ট এর। কারণ আসলে আমার লক্ষ্য ছিল সেখানে যাওয়াটা দেখানো। এই দেখানো, শেয়ার করা, নিজেকে একটু অন্যরকমভাবে উপস্থাপন করার মধ্যেই লুকানো থাকে একটা কমন মনস্তত্ত্ব – যার নাম সোশ্যাল কারেন্সি।
Social Currency মানে হলো আমরা এমন কিছু শেয়ার করতে চাই, যেটা বললে অন্যরা ভাবে – এই মানুষটা একটু স্মার্ট, একটু আলাদা, একটু বেশি interesting। আগারগাঁওয়ের কেক, সিনেমার ভিড়, কোন পশ রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া – সব জায়গাতেই একই মানসিকতা কাজ করে।

কেউ ভাবতে পারেন এটা শুধু আমাদের বাঙালির অভ্যাস, কিছু একটা পেলেই টেনে লম্বা করতে হবে। কিন্তু না – এটা পুরো দুনিয়ার মানুষেরই আচরণ। ২০০৪ সালে ফিলাডেলফিয়ায় Howard Wein নামে একজন খুলেছিলেন Barclay Prime নামে একটি বিলাসবহুল স্টেকহাউস। সমস্যা ছিল – শহরে এমন দামি জায়গা আগেও ছিল। নতুন হিসেবে নজর কাড়াটা কঠিন।
তখন তাঁরা শুরু করল ১০০ ডলারের চিজস্টেক বিক্রি করা, যেখানে নরমাল চিজ স্টেক এর দাম ৪/৫ ডলার মাত্র। ১০০ ডলারে সব প্রিমিয়াম জিনিস- কোবে বিফের নরম স্লাইস, ঘরে বানানো ব্রায়োশ রোলের মিষ্টি গন্ধ, ধীরে ধীরে ক্যারামেলাইজ হওয়া পেঁয়াজের মোলায়েম টেক্সচার, ট্রিপল-ক্রিম তেলেগিও চিজের ঘন স্বাদ, তার উপর ব্ল্যাক ট্রাফল আর বাটার-পোচড লবস্টারের পুরো রাজকীয়তা। আর এই অভিজাত সবকিছুর শেষে ঠান্ডা শ্যাম্পেন।
এটা শুধু একটা চিজস্টেক ছিল না – এটা ছিল এমন একটা গল্প, যেটা খাওয়ার আগেই মানুষ বলতো, খাওয়ার পরেও বলতো, আর বাড়ি ফিরে আবার বলতো। কারণ খাবারের চেয়ে বড় ছিল দামটা, আর দামটার চেয়ে বড় ছিল সেই “অদ্ভুত” অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ। মানুষ বলত – “জানো, ফিলাডেলফিয়ায় একটা স্যান্ডউইচের দাম নাকি ১০০ ডলার!” কেউ গিয়ে খেতো, কেউ না খেয়েও গল্পটা সামনে ধরে রাখত।
মিডিয়া তো এমন পাগলামি ছাড়বে কেন? USA Today থেকে Wall Street Journal – সবাই লেখালেখি শুরু করল। টক শোতে আলোচনার টেবিলে উঠল সেই স্যান্ডউইচ। যারা খায়নি, তারা কথা বলল। যারা খেয়েছে, তারা রীতিমতো গর্ব করে বলল। এক রাতের মধ্যে Barclay Prime-এর নাম ছড়িয়ে পড়ল শহর পেরিয়ে দেশজুড়ে।
এখান থেকেই মূল শিক্ষা – Social Currency। মানুষ এমন গল্পই শেয়ার করে যেগুলো শেয়ার করলে তাদের দেখে বাকিরা একটু পশ, একটু better, একটু interesting মনে করে। আমরা পোশাক, ফোন বা ব্র্যান্ড দিয়ে যেমন নিজের ইমেজ তৈরি করি, তেমনি কথার মাধ্যমেও করি। আমরা সেই গল্প বলি যেগুলো বললে নিজের সম্পর্কে নিজেই ভালো লাগে।
গবেষণায় দেখা গেছে – নিজের কথা বলতে পারলেই আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দ তৈরি হয়, অনেকটা খাবার খাওয়ার বা টাকা পাওয়ার মতো আনন্দ। তাই মানুষ এমন কন্টেন্টই শেয়ার করে যা তাকে অন্যদের চোখে একটু আলাদা করে। এখন তাহলে এই সোশ্যাল কারেন্সিকেই আমরা কীভাবে ব্যবহার করতে পারি, সেটাই ভাবনার আর শেখার বিষয় …


