আমার নানী সেবা প্রকাশনীর সব বই পড়তেন। প্রথম নাতি হিসেবে মাসুদ রানার সাথে নাম মিলিয়ে তাই নাম রেখেছিলেন “রানা”।
প্রথম ধাক্কা খাই ১৩ বছর বয়সে। মায়াময় দুটি চোখ হবার কথা ছিলো আমার। কিন্তু কেন যেন আয়নার সামনে সারাক্ষন দাঁড়িয়ে থেকেও নিজের চোখে মায়া খুঁজে পাইনি। কেমন গরুর মত গোল গোল বড় বড় ২টা চোখ।
পরের ধাক্কা ২১ বছর বয়সে এসে। কোন ভাবেই হিসেব মেলাতে পারছিলাম না। ৫ ফুট ১১ ইঞ্চির বদলে টাইনেটুনে ৫ ফুট ৮। বিজ্ঞান বলে, দড়ি দিয়ে টানলেও আর লম্বা হবার কথা না। বয়স পার হয়ে গিয়েছে।
শেষমেশ আমার আর মাসুদ রানা হওয়া হয়না, আমি মেহেদী হাসান রানা-ই হয়ে থাকি।
যাই হোক, সারা বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশেও দেখি বেশিরভাগ ব্র্যান্ড নাম ঠিক করতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে। নাম দেয়া নিয়ে রিসার্চ, কনসালট্যান্ট, ওয়ার্কশপ – কত কিছুই না হয়।
আজকে একটা ভিন্ন গল্প শুনি। ১৮৮৪ সালে তখনকার অবিভক্ত বাংলার গ্রামাঞ্চলে এক আয়ুর্বেদিক ডাক্তার ছিলেন – ডা. এস কে বর্মন। ম্যালেরিয়া, প্লেগ, কলেরা – এসব রোগের জন্য তার প্রাকৃতিক চিকিৎসা এতটাই কার্যকর ছিল যে মানুষ তাকে সত্যিকারের বিশ্বাস করত। রোগীরা তাকে ডাকত ডাক্তার বর্মন।
সময়ের সাথে সাথে তারা শব্দদুটোকে ছোট করে ফেলল – Doctor-এর Da আর Burman-এর Bur মিলিয়ে হয়ে গেল Dabur। আর মজার বিষয় হলো, যখন তিনি নিজের ছোট্ট দোকান থেকে ব্যবসা শুরু করলেন, সেই ভালোবাসার ডাকটাই হয়ে গেল তার ব্র্যান্ড এর নাম।

এই নামের পেছনে কোনো কনসালট্যান্ট ছিল না, কোনো মার্কেটিং টিম ছিল না – ছিল রোগীদের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর তাঁর নেয়া যত্নের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কলকাতার সেই ছোট দোকানটা রোগীদের সাপোর্টে এত বড় হয়ে উঠল যে ১৮৯৬ সালে তাকে আলাদা প্রোডাকশন ইউনিট বানাতে হলো। আর ১৯১৯ সালে তৈরি করলেন R&D ল্যাব – যাতে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান আর আধুনিক কোয়ালিটির একটা সংমিশ্রণ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে Dabur হয়ে উঠল এক বৈশ্বিক আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান, আজ যার পণ্য বিক্রি হয় ১২০টিরও বেশি দেশে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ব্র্যান্ডিং ম্যাজিকটা এখানে অন্যরকম। যখনই কেউ বলে Dabur, তারা অজান্তেই উচ্চারণ করে ফেলে সেই বিশ্বাস, সরলতা, ভালোবাসা- সহমর্মিতা – যা একশো বছরেরও বেশি সময় আগে ডাক্তার বর্মনের রোগীরা তাকে উপহার দিয়েছিল। এই নাম এমন একটা আবেগ, যেটা বিজ্ঞাপনের আগেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।
মানুষের সাথে রিলেশন এর থেকে যদি কোন নাম জন্ম নেয়, সেই নাম যেকোন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আপনাকে সবসময় অনেক দূরে এগিয়ে রাখবে।
তাই ব্র্যান্ডের নাম ঠিক করার সময় এভাবে ভাবা যেতে পারে। ভালোবাসা, অভ্যাস থেকে আপন মনেই যদি আমার ব্রান্ড এর নাম মানুষের মুখে থাকে, ক্ষতি কী?


